ব্যবসায়িক চশমায় পরিবেশ: নীতি নির্ধারণে কি স্বার্থের সংঘাত ঘটবে ?

প্রাককথনঃ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে ফেনী-৩ (দাগনভূঞা-সোনাগাজী) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। দল থেকে তাঁকে বর্তমান সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ সুপারিশ করেছে। তিনি এখন বর্তমান সরকারের উক্ত মন্ত্রণালয়ের একজন মন্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। তবে আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতো একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিকে যখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল ও কারিগরি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন জনমনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। দেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী এবং প্রভাবশালী এই ব্যক্তির মন্ত্রিত্ব লাভের বিষয়টি যেমন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, তেমনি এটি কতটুকু প্রাসঙ্গিক বা কার্যকর হবে, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রাসঙ্গিকতা ও চ্যালেঞ্জ: আবদুল আউয়াল মিন্টু বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের খাতের এক কিংবদন্তি। এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি এবং মাল্টিমোড গ্রুপের প্রধান হিসেবে তার সাংগঠনিক ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা প্রশ্নাতীত। তবে প্রশ্ন জাগে শিল্পের প্রসার এবং পরিবেশের সুরক্ষা কি একই সরলরেখায় চলতে পারে? আবদুল আউয়াল মিন্টুর এই দায়িত্বে যে চ্যালেঞ্জগুলো পরিবেশবিদ, পরিবেশ একটিভিস্ট বা পরিবেশ প্রেমিকরা অনুভব করা শুরু করেছে তা নীচে যৎসামান্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। ১. স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest): আবদুল আউয়াল মিন্টু এমন সব ব্যবসার সাথে যুক্ত (যেমন: জাহাজ শিল্প, কৃষি ও বীজ ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট), যেগুলোর সাথে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা রেগুলেশনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একজন বড় মাপের শিল্পপতি নিজেই যখন পরিবেশের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক হন, তখন তার ব্যবসায়িক স্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ের মধ্যে এক ধরনের 'কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট' তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দেশের বনভূমি রক্ষা কিংবা দূষণকারী শিল্পের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। ২. কারিগরি জ্ঞানের অভাব: পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত এবং বৈজ্ঞানিক বিষয়। আন্তর্জাতিক মহলে জলবায়ু তহবিলের দরকষাকষি থেকে শুরু করে দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা প্রতিটি পদক্ষেপে দরকার গভীর বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি জ্ঞান। একজন ব্যবসায়ীর পক্ষে এই জটিল বিষয়গুলো কেবল প্রশাসনিকভাবে সামলানো চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। ৩. শিল্প বনাম পরিবেশের দ্বন্দ্ব: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিল্পায়ন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু শিল্পায়নের চাপে প্রতিনিয়ত নদী দখল ও বন উজাড় হচ্ছে। একজন শিল্পপতি হিসেবে তার দৃষ্টিভঙ্গি কি 'শিল্প-বান্ধব' হবে নাকি 'প্রকৃতি-বান্ধব' ? যদি তিনি শিল্পোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতিতে নমনীয় হন, তবে সেটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইতিবাচক সম্ভাবনা: সমালোচনার বাইরে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আবদুল আউয়াল মিন্টু একজন দক্ষ বৈশ্বিক যোগাযোগকারী। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য বড় অঙ্কের ফান্ড বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রে তার ব্যবসায়িক ও কূটনৈতিক চাতুর্য কাজে আসতে পারে। এছাড়া, পরিবেশ সংরক্ষণে বেসরকারি খাতকে (Private Sector) যুক্ত করার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে।তাই আমরা তাঁর কাছে এ বিষয়ে আশা করতেই পারি। উপরে যেসকল চ্যালেঞ্জগুলো আমরা দেখছি, আশাকরি উনার মতো একজন বিচক্ষণ ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের পরিবেশের উন্নয়নে শিল্পের মধ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দেশ বিদেশে সেটি বোঝাতেও সক্ষম হবেন। শেষ কথা: আবদুল আউয়াল মিন্টুকে পরিবেশ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া একটি সাহসিকতাপূর্ণ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এটি তখনই প্রাসঙ্গিক হবে যখন তিনি তার ব্যবসায়িক সত্তাকে মন্ত্রিত্বের চেয়ার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে পারবেন। একজন সফল ব্যবসায়ীর দক্ষতা যদি সত্যিকারে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় নিবেদিত হয়, তবেই এই নিয়োগ সার্থকতা পাবে। অন্যথায়, শিল্পপতির হাতে পরিবেশের ভার দেওয়ার বিষয়টি 'বেড়া দিয়ে ক্ষেত খাওয়ার' মতো আশঙ্কায় পর্যবসিত হতে পারে। -------------------------- লেখক: মো: শহিদুল ইসলাম. নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক rshahid_546@yahoo.com

Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রসীমা ভেঙে সাম্রাজ্য: আমেরিকার আগ্রাসন, ভেনিজুয়েলা ও মানবতার লাশ

Failure to Ban Highly Hazardous Pesticides (HHPs) Violates Human Rights

উত্তরে বন্যা ও অসাম্য উন্নয়ন দর্শন

বরেন্দ্র অঞ্চলে প্লাস্টিক মুক্ত কৃষি ও জীবন গড়তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা: একটি নৃতাত্বিক মাঠ পর্যবেক্ষণ

হৃদয়হীন প্রযুক্তির যুগে প্রাণের নিঃশব্দ মৃত্যু

শুকনো নদীর বুকে বিষের স্রোত