শুকনো নদীর বুকে বিষের স্রোত


রাজশাহী, যে শহর এক সময় পদ্মা, বারনই, নবগঙ্গা, বারহী, বড়াল, শিবনদী আর অসংখ্য খাল-বিলের জলধারায় জীবন্ত ছিল, আজ সেখানে কেবল শুকিয়ে যাওয়া নদীর তলদেশ ও দূষিত বর্জ্যের স্তূপ। এক সময় এই নদীগুলোই কৃষিকে সেচ দিত, মাছ ও প্রাণবৈচিত্র্যের আশ্রয় ছিল। এখন সেগুলো কেবল স্মৃতির নদী। শহরের তরল বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন, ও রাসায়নিক বর্জ্য প্রতিদিন এই নদীগুলোর গায়ে ঢেলে দিচ্ছে মৃত্যুর রং।

নদীর বুকে বিষের স্রোত

রাজশাহী নগরের অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত নবগঙ্গা, বারহী ও বারনই নদী এখন মৃতপ্রায়। শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ১২টির বেশি পয়েন্ট দিয়ে তরল বর্জ্য সরাসরি নদী ও বিলের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এই বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে হাসপাতাল, ওয়ার্কশপ, ট্যানারি ও গৃহস্থালির রাসায়নিক মিশ্রিত পানি।
ফলে নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্য, নদীর তলদেশে জমেছে ভারী ধাতু ও প্লাস্টিক। মাছ নেই, ব্যাঙ নেই, শামুক-ঝিনুক বিলুপ্ত প্রায়। বরং বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক ধরনের বিষাক্ত গন্ধ, যা কাছের বাসিন্দাদের জীবনকেও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

বিলের মৃত্যু, কৃষির ধ্বংস

রাজশাহীর চারপাশের ভুগরোইল বিল, নওহাটা মৌজা বিল, বিলনচর, বিলদুর্গাপুর, বিলঝিনুক, বিলকীর্তিপুর, বিলমহিষবাথানসহ অসংখ্য বিল এখন বর্জ্যের আধার। এসব বিলে বৃষ্টির পানি জমে থাকলেও তার সঙ্গে মিশে যায় শহরের ড্রেনের দূষিত তরল। ফলে পানিতে চাষাবাদ হয় না, মাছ বাঁচে না। কৃষকরা বাধ্য হয়ে গভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভর করছেন, এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে রাজশাহীর নদী ও বিল একে একে মরে যাচ্ছে, কৃষিও হারাচ্ছে তার প্রাণশক্তি।

পরিবেশের নতুন জনদুর্যোগ

নদী ও বিলের এই মৃত্যু শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; এটি এখন এক মানবসৃষ্ট পরিবেশ জনদুর্যোগ

  • নদী শুকিয়ে যাওয়ায় আশপাশের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, শহর হয়ে উঠছে তাপদগ্ধ।

  • নদীপাড়ের মৎস্যজীবী, মাঝি, ঘাটশ্রমিকসহ হাজারো মানুষ জীবিকা হারাচ্ছে।

  • দূষিত পানির কারণে ত্বক রোগ, ডায়রিয়া, ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

  • প্লাস্টিক ও বর্জ্য জমে নদীর তলদেশে অগ্নিদুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

এই শহর এখন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক শ্বাস-প্রশ্বাস।

প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও আইনি শূন্যতা

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো কার্যকর শোধনাগার (Effluent Treatment Plant) নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে তদারকির অভাব চরম। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। অন্যদিকে পরিবেশ আদালত থাকলেও জনগণের সরাসরি মামলা করার সুযোগ না থাকায় ন্যায়বিচারও অধরাই। ফলে শহরের নদীগুলো বাঁচানোর জন্য নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর প্রশাসনিক দেয়ালে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

আবশ্যক নাগরিক জাগরণ ও নীতি পরিবর্তন

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘রাজশাহী সবুজ সংহতি’ দীর্ঘদিন ধরে নদী ও জলাশয় রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে তরল বর্জ্যের প্রবাহ সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে।
সংগঠনটি জোর দাবি জানিয়েছে—
১. রাজশাহী শহরে জরুরি ভিত্তিতে তরল বর্জ্য শোধনাগার (ETP) স্থাপন করতে হবে;
২. প্লাস্টিকমুক্ত নগরব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে;
৩. নবগঙ্গা, বারহী ও বারনই নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে;
৪. শহরের বিল ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর মানচিত্র ও ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে;
৫. স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নদী ও পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে।

শেষ কথা

শুকনো নদীর বুকে বিষের কান্না শুধু পানির শোক নয় , এটি জীবনের শোক। নদী হারালে হারিয়ে যায় মাটি, ফসল, সংস্কৃতি, এমনকি আমাদের অস্তিত্ব। রাজশাহী শহরকে যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তাহলে প্রথমেই ফিরিয়ে আনতে হবে নদীর প্রবাহ, থামাতে হবে দূষণের স্রোত। নদী বাঁচলে তবেই রাজশাহী বাঁচবে , এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: 

মো. শহিদুল ইসলাম

নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গেবেষক

#পরিবেশ

#নগরজীবন

#নদী

#রাজশাহী

#river


Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রসীমা ভেঙে সাম্রাজ্য: আমেরিকার আগ্রাসন, ভেনিজুয়েলা ও মানবতার লাশ

ব্যবসায়িক চশমায় পরিবেশ: নীতি নির্ধারণে কি স্বার্থের সংঘাত ঘটবে ?

Failure to Ban Highly Hazardous Pesticides (HHPs) Violates Human Rights

উত্তরে বন্যা ও অসাম্য উন্নয়ন দর্শন

বরেন্দ্র অঞ্চলে প্লাস্টিক মুক্ত কৃষি ও জীবন গড়তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা: একটি নৃতাত্বিক মাঠ পর্যবেক্ষণ

হৃদয়হীন প্রযুক্তির যুগে প্রাণের নিঃশব্দ মৃত্যু