বরেন্দ্র অঞ্চলে প্লাস্টিক মুক্ত কৃষি ও জীবন গড়তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা: একটি নৃতাত্বিক মাঠ পর্যবেক্ষণ
বরেন্দ্র অঞ্চলে প্লাস্টিক মুক্ত কৃষি ও জীবন গড়তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা: একটি নৃতাত্বিক মাঠ পর্যবেক্ষণ।
.jpg)
ভূমিকা
বরেন্দ্র অঞ্চল বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এক বির্স্তীণ এলাকা। একদিকে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, অন্যদিকে জলসংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এই অঞ্চলের জীবনযাপন ও কৃষিকে করেছে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। বিগত এক দশকে আধুনিক কৃষি প্রবাহে প্লাস্টিকনির্ভর পদ্ধতির আগ্রাসনে এখানে জমির উর্বরতা, পানি ও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, স্থানীয় কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী নিজেরাই শুরু করেছে প্লাস্টিকমুক্ত কৃষি ও টেকসই জীবনের এক নবযাত্রা। এটি কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্বিক রূপান্তর।
স্থানীয় কৃষক এবং প্রবীণদের তথ্যানুযায়ী-নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র এলাকায় ২০১০ সালের পর থেকে প্লাস্টিক ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে, বিশেষ করে ফসলে প্লাস্টিকের মালচিং শিট, ফলের বাগানে প্লাস্টিকের ব্যাগ, প্লাস্টিক পাইপ, প্যাকেটজাত বীজ ও কীটনাশক বোতলের মাধ্যমে। মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ কৃষক জানেন না কীভাবে এই প্লাস্টিকসমূহ ব্যবস্থাপনা করতে হয়। এগুলো জমিতেই পচে না এবং জমির নিচে দীর্ঘমেয়াদি দূষণ তৈরি করে। এছাড়া, প্লাস্টিকের আগ্রাসন শুধু মাটির নয়,এটি স্থানীয় কৃষির লোকায়ত জ্ঞান, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপরও প্রভাব ফেলেছে। একসময় বংশানুক্রমে কৃষকরা গবাদিপশুর গোবর, পচা পাতা ও নিজস্ব বীজ ব্যবহার করে কৃষিকাজ করতেন; এখন তা অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা চর্চা ও প্লাস্টিকমুক্ত কৃষির পথে জনগণের রূপান্তর:
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক ২০১০ সাল থেকে কৃষিপ্রতিবেদ্যা চর্চা, লোকায়ত জ্ঞান, জলবায়ু ন্যায্যতা, খাদ্য ও বীজ সার্বভৈৗমত্ব প্রতিষ্ঠায় জনগোষ্টীর নিজস্ব উদ্যোগগুলোতে সহায়ক হিসেবে ভুমিকা পালন করছে। পরিবেশবান্ধব লোকায়ক কৃষি চর্চা, স্থানীয় সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে স্থানীয় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এই কাজ বারসিকের বরেন্দ্র অঞ্চলের একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেখানে ন্যাচার বেজ সল্যুউশনকে প্রাধান্য দেয়া হয়, যাতে স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নসহ প্রাণপ্রকৃতি তার সহবাস্থানে থেকে একটি আন্ত:নির্ভশীল উন্নত সমাজ বির্নিমানে ভুমিকা পালন করতে পারে। বারসিক এবং জনগোষ্টীর যৌথ উদ্যোগে কৃষিপ্রতিবেশ চর্চার কাজগুলো প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে ২০২৩-২০২৫ সময়কালে বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাগঞ্জ উপজেলার তানোর, পবা ও নাচাল উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৮টি গ্রামে যেমন- তানোর পৌরসভার গোকুল-মথুরা, মোহর, মন্ডুমালা মাহালী পাড়া, দুবইল, সিন্দুকাই, হরিদেবপুর, বিলনেপাল পাড়া, খড়িবোনা গ্রামে একটি বিশেষ ধারা তৈরি হয়েছে। কৃষক ও নারী কৃষিশ্রমিকদের জ্ঞান অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ফলে নিজস্ব প্রচেষ্টায় গড়ে উঠছে এক কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা নির্ভর ও প্লাস্টিকবর্জিত কৃষি ও জীবনব্যবস্থা। উক্ত গ্রামগুলোতে মাঠ প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ, কর্মসূচীর সাথে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও দীর্ঘসময় অবস্থান করাসহ তাত্বিক পর্যবেক্ষণে নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো:
স্তানীয় উপকরণের ব্যবহার ও লোকায়ত কৌশলের পুনরুদ্ধার:
স্থানীয়রা আবার ব্যবহার করছে গোবরে পচানো তরল সার এবং লাল মরিচ ও নিমপাতা দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক কীটনাশক। এগুলোর সংরক্ষণ ও প্রয়োগে প্লাস্টিক নয়, ব্যবহৃত হচ্ছে মাটির হাঁড়ি, কলস, বাঁশের ডোল। মোসা: সুলাতানা খাতুন। রাজশাহীর পবা উপজেলার দর্শনপাড়া ইউনিয়নের একজন কৃষাণি। তিনি একজন প্রাকৃতিক চর্চাকারী কৃষাণী। দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় থেকে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা চর্চা নিজে করছেন এবং গ্রামের অন্যান্য কৃষকসহ কৃষাণীদের চর্চা করতে জ্ঞান অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে সহায়তা করছেন। তিনি তাঁর বাড়িতে একটি কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। তিনি মাটির ডোগা এবং হাড়িতে করে জৈববালাই তৈরী করেন , নিজে ব্যবহার করেন এবং অন্যকে ব্যবহার করতে উৎসাহ দেন। তিনি তার এরাকায় ২০ টি মডেল শতবাড়ি তৈরীতে ভূমিকা রেখেছেন। যেখানে একটি পরিবার তাঁর নিজস্ব শস্য ফসলের চাহিদা মেটান নিজেই উৎপাদন করে। নিজেরা জৈবসার, প্রাকৃতিক জৈব বালাই নিজেরা তৈরী করে ব্যবহার করেন। জমিতে গোবর সার এবং প্রাকৃতিক জৈব সার ব্যবহার করেন। নিরনাপদ সবজি উৎপাদন করেন। বারসিক রাজশাহী তথা বরেন্দ্র অঞ্চল কর্মএলাকাগুলোতে এরকম এ পর্যন্ত ২০১ টি মডেল শতবাড়ি এবং ৮টি কৃষিপ্রতিবেশ শিখন কেন্দ্র গড়ে তুলতে জনগোষ্টীর মতামত এবং উদ্যোগে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই সকল কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রে কোন ধরনের প্লাস্টিক উপকরণ ব্যবহার করা হয়না। তাঁদের মধ্যে দিয়ে সমাজ এবং দেশকে তারা একটি ম্যাসেজ দিতে চায় তা হলো-প্লাস্টিক ছাড়াও আমাদের চলা সম্ভব। এবং প্লাস্টিক আমাদের জীবন এবং কৃাষিকে সংকটে ফেলছে।
বীজের আন্তনির্ভতা ও প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে লড়াই:
নারীরা তৈরি করছেন ‘বীজ থলে’ পুরানো কাপড়, পাট বা কলাপাতা দিয়ে। আবার দীর্ঘসময় বীজ সংরক্ষনের জন্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে তাঁরা কাঁচের বয়াম, মাটির কলস, হাড়ি, কাচা মাটির তৈরী ধামা। শুধু বীজ নয়, তারা নিজেদের খাদ্য শস্যও এখানে সংরক্ষণ করে রাখেন। গ্রামীণ নারীরা বীজ সংরক্ষণে কীটনাশকের বদলে লোকায়ত জ্ঞানের ব্যবহারগুলো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বীজ সংরক্ষণে এখন তারা আর রাসায়নিব কীটনাশক ব্যবহার করেনা। বীজের গায়ে গোবল লিপন ও রোদে শুকিয়ে, নিয়মিত নিদিষ্ট তাপমাত্রা ঠিক করে তারা নিজেরা বীজসংরক্ষণ করেন। এতে করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক প্যাকেটের বিকল্প তৈরি হয়েছে। দিনে দিনে এসব ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীদের এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে নারীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা "কমিউনিটি সিড ব্যাংক" এর মাধ্যমে।
কমিউনিটি সিড ব্যাংকগুলো এই জটিল বাস্তবতায় কৃষকেরা, বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নিজেদের মতো করে পথ খুঁজে নিচ্ছেন। তাঁরাই গড়ে তুলছেন কমিউনিটি সিড ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো মূলত নিজস্ব বীজ সুরক্ষার কমিউনিটির লড়াই, যেখানে স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত, খরাপ্রতিরোধী, এবং ঐতিহ্যবাহী জাতের বীজ সংরক্ষণ, আদান-প্রদান ও প্রচার করা হয়। কমিউনিটি সিড ব্যাংকগুলো প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার একেকটি গ্রামীণ জবাব। তারা নিষিদ্ধ করেছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। একটি কমিউনিটি সিড ব্যাংকে কখনোই কোন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়না। নারীরা এই কমিউনিটি সিড ব্যাংক ব্যববস্থাপনায় প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন। বারসিকের কর্মএলাকায় প্রত্যক্ষ মাঠ পর্যবেক্ষণ, নথিপত্র ও প্রতিবেদন তথ্যানুযায়ী দেখা যায় বরেন্দ্র অঞ্চল তথা রাজশাহীর তানোর, পবা উপজেলাসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলায় বর্তমান (মে ২০২৫) ১৫টি কমিউনিটি বীজ ব্যাংক গড়ে উঠেছে। বীজগুলোর বীজবিনিময় রেজিষ্টার এবং কমিউনিটি বীজ ব্যাংক পরিচালানার সাথে যুক্ত নারীদের থেকে তথ্য অনুযায়ী জানা যায়- বিগত তিন বছরে প্রতিটি বীজ ব্যাংক থেকে গড়ে ৪৫০০ হাজার কৃষক-কৃষাণী বীজ বিনিময় করেছেন। একইসাথে এলাকায় দেশি জাতের বীজের ব্যবহার বেড়েছে। বিলুপ্ত দেশি জাতগুলো আবার ফিরে এসেছে। বিলনেপাল পাড়া কমিউনিটি বীজ ব্যাংকের পরিচালনাকারী কৃষাণী মোসা: সুলাতানা খাতুন বলেন- “ আমাদের এলাকায় গড় আলুর তিনটি জাত হারিয়ে গিয়েছিলো, পরে আমরা নাচোল এলাকা থেকে সেই বীজ সংগ্রহ করি, এখন তিনটি জাত আবার আমরা ফিরে পেয়েছি। নাচোল উপজেলার কৃষক রায়হান কবির রঞ্জু বলেন- আমাদের খরাসহনশীল জাতগুলো বৃদ্ধি পেয়েছে বীজ ব্যাংকের কারনে। আমরা বীজগুলো সুরক্ষা করি সবসময় প্লাস্টিক মুক্ত ভাবে। তানোর উপজেলার হরিদেবপুর কমিউনিটি সিড ব্যাংক পরিচালনাকারী কৃষাণী কবুলজান বলেন- আমরা বীজ রাখি আমাদের কায়দায়। কোন প্লাস্টিকের কৌটায় বা ব্যাগে রাখিনা। তিনি আরো বলেন- প্লাস্টিক মানেই আমাদের ক্ষতি, এই ক্ষতি আমরা নিজেরা করতে চাইনা, কাউকে করতেও দিতে চাইনা।
স্থানীয় দক্ষতার পুনর্মূল্যায়ন ও নবীন-প্রবীণদের সম্পৃক্ততা:
আমাদের হারানো জ্ঞান, অতীত কিছু প্রথা যেগুলো আমাদের পরিবেশ প্রাণ-প্রকৃতিকে সুরক্ষা করতে সহায়তা করে। যেগুলো হাজার হাজার বছর ধরে পরীক্ষিত জ্ঞান, সেগুলো আমাদের কৃষি চর্চার সাথে , একজনের থেকে আরেকজনার মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষার জন্য যেমন অত্যধীক শৈত্যপ্রবাহ থেকে বীজ তলা রক্ষায় পানি ছিটানো। ফসল পোকামাকড় রোগ প্রতিরোধে লোকায়ত জ্হান দক্ষতা প্রয়োগ ইত্যাদি। অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে গাছ পালা শিখর চেনা ও ব্যবহার ইত্যাদি ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। বারসিকের কর্মএলাকায় দেখা যায় তানোর হরিদেরপুর কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রে একটি অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্যের , শাক লতা পাতা ও ঔষধী গাছের বাগান করেছেন। সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থীসহ গ্রামের নবীনরা এসে এই গাছগুলো চিনে এবং এর গুণাগুণ সম্পর্কে ধারনা নেয়। এর ফলে দেখা গেছে নবীণদের মধ্যে এই বৃক্ষ-লতা পাতা সুরক্ষার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁদের মধ্যে নিজস্ব বীজ সুরক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষার চেতনাগুলো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে দেখা যায় পাশের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ছাত্র-শিক্ষকরা মিলে একটি দেশীয় প্রজাতির বীজ লাইব্রেরী গঠন করেছে। ২০১৯ সালে রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ আনন্দমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত সেই বীজ লাইব্রেরী থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বীজ বিনিময় করেন। বাড়িতে দেশিয় প্রজাতির সবজির চাষ করেন। তাদের বীজ লাইব্রেরীটিও ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক নিষিদ্ধ। তারা বাড়িতে যে সবজির চাষ করে সেখানেও রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেনা। ছাত্রদের মধ্যে প্লাস্টিক মুক্ত বীজ সংরক্ষণের লোকায় জ্ঞান প্রযুক্তিগুলো দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বীজ লাইব্রেরী কেন্দ্রিক স্থানীয় কৃষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি মেলবন্ধন তৈরী হয়েছে।
নৃতাত্বিক বিশ্লেষণ
এই পরিবর্তনটি কেবল একটি কৃষি প্রযুক্তির রূপান্তর নয়, বরং জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সংগঠনের এক মৌলিক রূপান্তর। একে বোঝার জন্য আমরা তিনটি নৃতাত্বিক পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহার করতে পারি।
প্রথমমত: ইকোলজিক্যাল নৃতত্ব: মানব ও প্রকৃতির আন্তঃসম্পর্ক স্থাপনের এক সচেতন প্রয়াস। স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সাথে খাপ খাওয়ানো জ্ঞানের পুনরুদ্ধার এখানে মুখ্য। কৃষকরা আবিষ্কার করেছেন- প্লাস্টিক দূষণ শুধু প্রকৃতি নয়, তাদের জীবিকা ও শরীরকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সাথে বেঁচে থাকার জন্য তাঁদের চারিপাশটা প্রাণ-প্রকৃতিতে সুস্থ রাখতে হবে, জীবীত রাখতে হবে। সবাই বাঁচলে মানুষও বাঁচবে। মানুষই শুধু একমাত্র প্রাণী নয় যে, সে অন্যকে শেষ করে নিজে বাঁচতে পারবে। মানুষ এবং প্রকৃতির সকল জীবন্ত উপাদান একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া বা আন্ত:নির্ভশলিতার মধ্যে দিয়েই টিকে থাকে। তাই মানুষকে টিকে থাকতে হলে তার আশ পাশের প্রাণ-প্রকৃতিকেও টিকিয়ে রাখতে হবে। তানা হলে মানবগোষ্টী ধ্বংসের কিনারে নিপতিত হবে। একইসাথে মানুষ তাঁর লোকায়ত জ্ঞানকে যতো বেশি ভুলে যাবে, ততো দ্রæত বিপদের দিকে এগিয়ে যাবে। প্লাস্টিক সভ্যতাকে উন্নত করেনি। সভ্যতাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মূলত তার ব্যবহার আর ব্যবস্থাপনার কারনেই এই ধ্বংসলীলা আরো দ্রæত এগিয়ে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত: নারী নেতৃত্বে স্থানীয় জ্ঞান: নারীরা এখন শুধু চাষাবাদ নয়, বীজের নির্বাচক, পুষ্টির ও স্বাস্থ্যের রক্ষক এবং পরিবেশ দূতের ভূমিকায়। জেন্ডার নলেজ নারীর ভূমিকাকে কেন্দ্র করে এই রূপান্তর ঘটছে। নারীরা শুধু কৃষি শ্রমিক নয়, জ্ঞান সংরক্ষক ও পরিবেশ-নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। বারসিকের মাঠ পর্যবেক্ষণ এবং কার্যক্রমগুলো প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় সেখানে প্রতি কার্যক্রমে নারীর অসামান্য অবদান রয়েছে। বীজ সংরক্ষণ, প্লাস্টিকমুক্ত পরিবার, কৃষি উপকরণ ব্যবহারে নারীর জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা বেশি। বারসিক নারীর এই জ্ঞান অভিজ্ঞতাকে সমর্থন ও সহায়তা করেছে, যাতে এটি আরো একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত: আন্দোলনের নৃতত্ব, এটি একটি নীরব সামাজিক আন্দোলন, যেখানে ন্যুনতম বাহ্যিক হস্তক্ষেপে ছাড়াই জনগণ নিজেরাই একটি নতুন জীবনের পথ নির্মাণ করছে। দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে দিয়ে প্রতিবাদের এক কৌশলী রুপ-যা নিিতনির্ধারকদের চোখে পড়েনা, কিন্তু প্রভাব ফেলে মাটিতে ও মানুষে। এটি মুখোমুখি কোন আন্দোলন নয়, এটি ‘নরম প্রতিরোধ’ (ংড়ভঃ ৎবংরংঃধহপব) এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা
নৃতাত্বিক এই মাঠ পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের কৃষি ব্যবস্থার ফলে পরিবারগুলোতে শিশুদের চর্মরোগ কমেছে, পানির দূষণ কমে গেছে এবং নারীদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা হ্রাস পেয়েছে। কৃষকরা কম খরচে উৎপাদন করতে পারছেন এবং ফলাফল হিসেবে বাড়ছে আত্মমর্যাদা ও খাদ্য-নিরাপত্তা।
চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত প্রাসঙ্গিকতা
বারসিকের কর্মএলাকাগুলো প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণসহ বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই যাত্রাপথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন- কৃষি বাজারে প্লাস্টিকনির্ভর চেইনের প্রভাব। জাতীয় নীতিগত এবং পরিবেশ আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা। প্লাস্টিকমুক্ত করনে আইন বাস্তবায়নে দূর্বলতা। নীতিগত উৎসাহ বা ভর্তুকির অভাব। জাতীয় এবং সরকারিভাবে প্লাস্টিকমুক্ত কৃষি উপকরণসহ, প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতির প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। সরকারি বেসরকারি প্রকল্পগুলোতে প্লাস্টিকে ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং প্লাস্টিক বিরোধী কার্যক্রমগুলো যুক্ত করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজন এমন নীতিমালা ও সহায়তা, যা এই স্থানীয় জ্ঞান ও উদ্যোগকে মর্যাদা ও শক্তি দেবে।
উপসংহার
বরেন্দ্র অঞ্চলের এই প্লাস্টিকমুক্ত কৃষি ও জীবনযাত্রা কেবল একটি পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন নয়, এটি একটি নৃতাত্বিক জাগরণ, যেখানে মানুষ তার মাটি, শরীর ও সমাজকে নতুনভাবে চিনছে। এই আন্দোলন থেকে আমরা শিখতে পারি, উন্নয়ন মানেই বাইরের সমাধান নয়- ভেতরের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও চর্চাকে নতুনভাবে সক্রিয় করা। বাংলাদেশের মাটিতে, বাংলাদেশের কৃষকের হাতে যে প্লাস্টিক মুক্ত আন্দোলন শুরু হয়েছে তা কেবল একটি পরিবেশগত প্রয়াস নয়, এটি একটি স্বাধীনতা ও সম্মানের সংগ্রাম, খাদ্য ও বীজ সার্বভৈৗমত্বের লড়াই, জলবায়ু ন্যায্যতাসহ প্লাস্টিকের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে টেকসই কৃষি ও স্বাস্থ্যবান সমাজ গড়ার যাত্রা। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সকলের সম্মিলিত চেষ্টাতেই সম্ভব হবে এই নবজাগরণকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করা।
উক্ত লিখার সূত্র:
০১. বারসিক কর্মএলাকায় প্রত্যক্ষ মাঠ পর্যবেক্ষণ।
০২. বারসিক এবং জনগোষ্টীর বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণ।
০৩. সাক্ষাৎকার ও বিষয় ভিত্তিক মুক্ত আলোচনা ।
০৪. এফজিডি ও সভা আয়োজন।
০৫. বারসিক’র মাসিক এবং বাৎসরিক অগ্রগতি প্রতিবেদন।
মো. শহিদুল ইসলাম
নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারি, বাংলাদেশে রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ।
shahidul546mh@gmail.com
.jpg)
Comments