বদলে যাওয়া বয়ান, জেগে ওঠা প্রজন্ম
বদলে যাওয়া বয়ান, জেগে ওঠা প্রজন্ম
একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে ইতিহাস শুধু অতীতের বিবরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও বটে। ইতিহাস যখন সত্যভিত্তিক ও ন্যায্য বয়ানে রচিত হয়, তখন তা একটি প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক চেতনা ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। কিন্তু সেই ইতিহাসই যখন বিকৃত, চুক্তিতর্কিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানে পরিবেশিত হয়—তখন একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে তার আত্মপরিচয়ের জায়গা হারাতে থাকে। বর্তমান পৃথিবীতে "ন্যারেটিভ" বা বয়ানের যে ক্ষমতা, তা কেবল গল্প বলার শক্তি নয়—এটি ইতিহাসকে পুনর্লিখে নতুন সত্য তৈরি করার এক কৌশল, যার প্রভাবে গড়ে উঠছে বিভ্রান্ত, শঙ্কিত, এবং অনেক সময় আত্মবিস্মৃত প্রজন্ম।
ইতিহাসের উপর নিয়ন্ত্রণ মানেই ভবিষ্যতের উপর নিয়ন্ত্রণ-
জর্জ অরওয়েল একবার বলেছিলেন, “Who controls the past controls the future; who controls the present controls the past.” এই বাণী আজকের বাস্তবতায় আরও গভীরভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। একবিংশ শতাব্দীতে ইতিহাস শুধুমাত্র গবেষণার বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, মিডিয়া প্রপাগান্ডা, কারিকুলামের নীতিনির্ধারণ এবং জাতীয়তাবাদের অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা যেমন একসময় তাদের "সভ্যতা" বয়ানে উপনিবেশিক লুণ্ঠনকে ন্যায্যতা দিয়েছিল, তেমনি আজও অনেক রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক গোষ্ঠী ইতিহাসের বিকল্প ব্যাখ্যা তৈরি করে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চায়।
আজকের ডিজিটাল যুগে প্রজন্ম সহজেই তথ্য পায়, কিন্তু সব তথ্য সত্য নয়। সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব ইতিহাসের ব্যাখ্যায় যে "ভিজুয়াল ন্যারেটিভ" তৈরি করছে, তা অনেক সময় সত্যের চেয়ে নাটকীয়তায় বেশি আগ্রহী। এর ফলে ঐতিহাসিক সত্য নয়, বরং আকর্ষণীয় কন্টেন্ট হয়ে উঠছে মানুষের স্মৃতি। অন্যদিকে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে সুদুর প্রসারি কৌশলী উদ্যোগ নবীন তরুণরা কোন কিছু বোঝার আগেই বিকৃত এক ইতিহাস সত্য ও যেক্তিক হিসেবে পুশ করা হচ্ছে। যার ফলে একটি প্রজন্ম এমন ইতিহাস পড়ে বড় হচ্ছে, যেখানে স্বাধীনতা সংগ্রাম বিতর্কিত, স্বাধীনতা নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, কমান্ডার প্রশ্নবিদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের ত্যাগকে ‘রাজনৈতিক পুঁজি’ বলা হচ্ছে, আর উপনিবেশবাদকে কখনও "সভ্যতার দান" হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। ইতিহাসকে যখন রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চে টেনে আনা হয়, তখন সত্য ম্লান হয়ে যায়, প্রজন্ম হয়ে পড়ে বিভ্রান্ত। বাংলাদেশের ৈএই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন প্রজন্মকে ক্ষিপ্ত করে তোলা হচ্ছে। তাদের ইতিহাসকেন্দ্রিক আক্রমণও এক ভয়ংকর রুপে দাড়িয়েছে। বাংলাদেশের ইতিাহাসকে কেহ দখল করতে ন্যারেটিভ সাজায় আবার কেহ ইতিহাসকে মুছে দিতেও ন্যারেটিভ তৈরী ও বাস্তবায়ন করছে।
বিকল্প ন্যারেটিভ ও প্রতিরোধের রাজনীতি-
যে মুহূর্তে একটি প্রজন্ম জানতে পারে যে তার শেখানো ইতিহাস অর্ধসত্য কিংবা ভ্রান্ত, তখন তার মধ্যে জন্ম নেয় একধরনের অস্তিত্ব সংকট। এই সংকট থেকে কেউ উদাসীনতায় ডুবে যায়, কেউ হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ। কিন্তু আবার কেউ কেউ এই সংকট থেকেই তৈরি করে নতুন ইতিহাস-সন্ধানী মন। এই মনই খোঁজে বিকল্প ন্যারেটিভ, যা রাষ্ট্রীয় পাটির ব্যাখ্যা নয়, বরং ভুক্তভোগী জনগণের কথা, প্রান্তিকের ভাষ্য, নারীর অভিজ্ঞতা, আদিবাসী স্মৃতি কিংবা উপনিবেশিত জাতির যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি।
এখানেই একটি জাগ্রত প্রজন্ম ইতিহাসকে শুধু পুনর্পাঠই নয়, পুনর্লিখনের সাহস দেখায়। আফ্রিকান সাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিয়োং’ও যেমন উপনিবেশিক ভাষা ও শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের মাতৃভাষায় লেখালেখির মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়েন, তেমনি আজও বিশ্বজুড়ে নানা প্রান্তে বিকল্প ইতিহাস রচনা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ইতিহাসবিদরা পিতৃতান্ত্রিক ইতিহাসের বিপরীতে ‘মুক্তির ইতিহাস’ লিখছেন; ল্যাটিন আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী উপনিবেশিক “আবিষ্কারের” ইতিহাসের বিপরীতে নিপীড়নের কথামালা তুলে ধরছে।
বাংলাদেশেও ইতিহাসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। মুক্তিযুদ্ধের সংখ্যা, নেতৃত্ব, আদর্শ নিয়ে বিতর্ক এতটাই প্রবল যে, শিক্ষার্থীরা প্রায়শই দ্বিধায় পড়ে, কারা মুক্তিযোদ্ধা, কারা দালাল, কারা শহীদ? সাম্প্রতিক সময়ে পাঠ্যবই থেকে গুরুত্বপূর্ণ কবিতা, গল্প কিংবা ঘটনার অপসারণ ও পরিবর্তন, রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী "বাছাই করা ইতিহাস" পাঠ করানো, এসবই প্রজন্মকে এক ধরনের দ্বিধা ও বিমূর্ততায় ঠেলে দিচ্ছে। ফলত, তারা কখনো ইতিহাসকে অবিশ্বাস করতে শেখে, কখনো তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর এই সুযোগ নিচ্ছে একটি ইতিহাস বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ। যারা যেই আদর্শের তারা সেই আদর্শে বাংলাদেশের ইতিহাসকে নিজের মতো করে সাজিয়েছে, সাজাচ্ছে। ক্ষমতা যখন যার, ইতিহাসও তখন তার হয়ে যায়। এভাবে সময়ে সময়ে ভ্রান্ত এবং প্রতিহিংসার ইতিহাসে আবেগিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম, আজকের প্রজন্ম। ইতিহাসের মৌলিকত্ব হারিয়ে যাচ্ছে।
তবুও আশার কথা, একটি নতুন প্রজন্ম এখন প্রশ্ন করতে শিখছে। তারা ইতিহাসকে নতুন করে জানার চেষ্টা করছে বিকল্প উৎস থেকে। প্রথমত তারা প্রবীণদের কথার উপর বিশ্বাস করতে পাচ্ছে। এছাড়াও ‘ওপেন অ্যাক্সেস আর্কাইভ’, ‘ভিজুয়াল হিস্ট্রি প্রজেক্ট’, লোক ইতিহাসের প্ল্যাটফর্ম, এসবের মাধ্যমে তারা শুনছে সেই কণ্ঠস্বরগুলো, যেগুলো দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। এই প্রজন্ম বুঝতে পারছে, ইতিহাস শুধু ‘উপস্থাপিত সত্য’ নয়, বরং তা এক ধরনের ‘ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যম’ও বটে। আর এই বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই তারা নতুন এক মনন তৈরি করছে, যেখানে ইতিহাস হবে সবার, যেখানে সত্যের দায় কেউ এড়িয়ে যেতে পারবে না।
শেষের কথা-
‘বদলে যাওয়া বয়ান’ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, ইতিহাস শুধু অতীত নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের হাতিয়ার। একটি জাগ্রত প্রজন্ম যখন ইতিহাসকে বুঝে, পুনরায় পড়ে এবং বিকল্প বয়ানে তা পুনর্নির্মাণ করে, তখনই জন্ম নেয় এক ‘দৃঢ় মস্তিষ্কের প্রজন্ম’, যারা আর বিভ্রান্ত হয় না, বরং প্রশ্ন করে, জবাব খোঁজে, এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইতিহাস তখন আর নিছক তথ্য নয়, বরং হয়ে ওঠে লড়াইয়ের ভাষা, মুক্তির পাঠ। দুটি বিষয়- ইতিহাস ও রাজনীতি হতে হবে জনগণের। এটি কোন দলের নয়।
লেখক:
মো. শহিদুল ইসলাম
নুবিজ্ঞানী।

Comments