রাষ্ট্রসীমা ভেঙে সাম্রাজ্য: আমেরিকার আগ্রাসন, ভেনিজুয়েলা ও মানবতার লাশ

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নির্মম সত্য আছে,আইন সবার জন্য নয় আইন আছে দুর্বলদের জন্য, আর শক্তিধরদের জন্য আছেজাতীয় স্বার্থ এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে আমেরিকা সরাসরি আক্রমণ করেছে, সরকার উৎখাত করেছে, নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে, কিংবা গোপনে রাষ্ট্র ভাঙার খেলায় নেমেছে।

ভেনিজুয়েলা সেই দীর্ঘ সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসের সাম্প্রতিক শিকার। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে, হ্যাঁ, নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে-আমেরিকা প্রকাশ্যেঅবৈধঘোষণা করে, তার মাথার দাম ঘোষণা করে, তার সম্পদ জব্দ করে, এমনকি আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে তাকে গ্রেফতার করে নিজ দেশ থেকে। কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের রায় ছাড়াই, কোনো জাতিসংঘ অনুমোদন ছাড়াই-এই কি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা?

আমেরিকা ভেনিজুয়েলায় যা করছে, তা গণতন্ত্র রক্ষা নয়,এটি নগ্ন দখলদারিত্ব। ইরাকের কথা মনে করুন।গণবিধ্বংসী অস্ত্রমিথ্যা প্রমাণিত হলেও দায় নেয়নি কেউ। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেল, একটি সভ্যতা ধ্বংস হলো, কিন্তু ওয়াশিংটনে কেউ যুদ্ধাপরাধী হলো না। আফগানিস্তানে বিশ বছরের দখলদারিত্বের পর আমেরিকা চলে গেলরেখে গেল ধ্বংস, শরণার্থী আর অনিশ্চয়তা। লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে উৎখাত করে দেশটিকে এমন নৈরাজ্যে ঠেলে দেওয়া হলো, যেখানে আজ দাসবাজার পর্যন্ত ফিরে এসেছে।

এই একই ছক, প্রথমে শয়তান বানাও, তারপর আক্রমণকে ন্যায্য করো, ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অর্থনীতি শ্বাসরুদ্ধ করা হয়, তারপর সেই মানবিক সংকটকেই দেখিয়ে বলা হয়-“দেখুন, সরকার ব্যর্থ।অথচ ওষুধ আসতে না পারা, খাদ্য সংকট, মুদ্রার ধস,সবই নিষেধাজ্ঞার সরাসরি ফল। এটি কোনো মানবিক নীতি নয়; এটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো- আমেরিকা এখন আর শুধু দেশ দখল করে না, তারা রাষ্ট্রনেতাকে অপহরণ বা গ্রেফতার করার অধিকারও নিজের হাতে তুলে নিয়েছে যদি আজ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ধরে নিয়ে যাওয়া যায়, তবে কাল যে কোনো দেশের ক্ষেত্রেই তা করা যাবে। এটাই কি নতুন বিশ্বব্যবস্থা?

এই আগ্রাসনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কারা? কোনো প্রেসিডেন্ট নয়, ভুক্তভোগী হলো সাধারণ মানুষ। শিশু, নারী, শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক- যারা কোনো ভূরাজনৈতিক খেলায় অংশ নেয়নি, কিন্তু শাস্তি পাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। মানবাধিকারের বুলি যারা আউড়ায়, তারাই সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন করে।

এখানে প্রশ্নটা স্পষ্টভাবে তুলতে হবে, আমেরিকার কি বিশ্বের পুলিশ হওয়ার অধিকার আছে? কে তাকে এই ক্ষমতা দিয়েছে? জাতিসংঘ? আন্তর্জাতিক আইন? নাকি কেবল অস্ত্র, ডলার আর সামরিক ঘাঁটি?

রাষ্ট্রসীমা লঙ্ঘন মানে শুধু ভূখণ্ডে ঢোকা নয়, এটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লঙ্ঘন। ভেনিজুয়েলা হোক বা ইরাক, এই আগ্রাসন একই কথা বলে, শক্তি থাকলে আইন ভাঙা যায়, মানবতা উপেক্ষা করা যায়।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, সাম্রাজ্য টেকে না। রোম টেকেনি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য টেকেনি, আমেরিকান সাম্রাজ্যও টিকবে না। প্রশ্ন হলো, তার পতনের আগে আর কত দেশ, কত মানুষ বলি হবে?

এই প্রশ্ন শুধু ভেনিজুয়েলার নয়, এই প্রশ্ন আমাদের সবার।


লেখক:

মো. শহিদুল ইসলাম

নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক।

#venezuela #America #war

Comments