বরেন্দ্র অঞ্চলের শস্য ফসলের বৈচিত্র্য ও কৃষি সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় নতুন শক্তি কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্র

Agroecology Learning Centers Protecting Crop Diversity and Agricultural Sovereignty in Barind বাংলাদেশের কৃষি আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও পানির সংকট; অন্যদিকে কর্পোরেট বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা কৃষককে ক্রমেই বাজারের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে। এই বাস্তবতায় কৃষকের হাতে আবারও কৃষির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার যে আন্দোলন, তার অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠছে কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্র। বরেন্দ্র অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের কৃষকরা খরা, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা করছেন। একসময় এখানকার কৃষি ছিল দেশি বীজ, ফসল বৈচিত্র্য ও প্রকৃতিনির্ভর চর্চার ওপর দাঁড়িয়ে। ধীরে ধীরে সেই চর্চা হারিয়ে যাওয়ায় কৃষি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিক (ইঅজঈওক- ইধহমষধফবংয জবংড়ঁৎপব ঈবহঃৎব ভড়ৎ ওহফরমবহড়ঁং কহড়ষিবফমযব) বরেন্দ্র অঞ্চলে স্থানীয় কৃষক-কৃষাণীদের সঙ্গে কাজ করে মোট ১০টি কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেদ্র গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্র-অমৎড়বপড়ষড়মু খবধৎহরহম ঈবহঃৎব (অখঈ) মূলত মাঠভিত্তিক একটি শিক্ষালয়, যেখানে কৃষক নিজের জমিকে পাঠশালা হিসেবে ব্যবহার করে শিখছেন প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষি পদ্ধতি। এখানে কোনো শ্রেণিকক্ষ বা আনুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রম নেই; আছে অভিজ্ঞতা বিনিময়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যৌথ শেখার প্রক্রিয়া। কৃষকরা শিখছেন কীভাবে কম পানি ব্যবহার করে ফসল ফলানো যায়, কীভাবে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা যায় এবং কীভাবে দেশি বীজের ওপর নির্ভর করে টেকসই কৃষি গড়ে তোলা সম্ভব। একইসাথে নিজের পরিবেশ প্রতিবেশ ভালো রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগসহ সরকারি সেবা ও অধিকার প্রাপ্তীতে করনীয় দিকগুলোও আলোচনা হয়ে থাকে। এই শিখন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে কমিউনিটি সিড ব্যাংক। বরেন্দ্র অঞ্চলে বারসিকের সহায়তায় গড়ে ওঠা কমিউনিটি সিড ব্যাংকগুলো কৃষি সার্বভৌমত্ব রক্ষার ভিত্তি শক্ত করেছে। কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রগুলোতে কৃষকরা শুধু উৎপাদন কৌশলই শিখছেন না, তারা শিখছেন বীজ সংরক্ষণ, বীজ নির্বাচন এবং বীজ বিনিময়ের গুরুত্ব। ফলে বীজ আর বাইরের কোম্পানির পণ্য নয়, বরং কৃষকের নিজস্ব সম্পদ হিসেবে ফিরে আসছে। নিরাপদ কৃষি করতে জৈবসার ও জৈববালাই তৈরীর কৌশল এবং জ্হান অভিজ্ঞতাগুলো বিনিময় করছেন। রাজশাহীর তানোর উপজেলার গোকুল মথুরা কৃষিপ্রতিবেশ শিখন কেন্দ্রের পরিচালনাকারী কৃষক জীতেন্দ্র নাথ বলেন- “ এখানে দেশি বীজসহ উন্নত বীজ কিভাবে সংরক্সণ করা যায় তা আমরা অভিজ্ঞতা বিনিময় করি, একইসাথে কিভাবে নীম, মেহগণি, শিম পাতাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ দিয়ে কিভাবে জৈববালাই তৈরী করা যায় তা শিখি , জৈবসার, ভার্মীকম্পোস্ট, কুইক কম্পোস্ট কিভাবে তৈরী ও ব্যভহার করা হয় তা এই শিখন কেন্দ্রে শিখানো হয়। এগুলো শুধু শেখার মধ্যে থাকেনা, তা আমরা চর্চা করি, কাজে লাগাইল। ” শিখন কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কৃষকরা ধীরে ধীরে দেশি ও উন্নত বীজের দিকে ফিরছেন। দেশি বীজের বিলুপ্তির হাত থেকে কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রগুলো অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। পবা উপজেলার বিলনেপাল পাড়া কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রের পরিচালনাকারী কৃষাণী মোসা: সুলতানা খাতুন বলেন আমাদের শিখন কেন্দ্রে ১৮৫ জাতের বীজ সংরক্ষিত আছে। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রটিতে একটি কমিউনিটি বীজ ব্যাংকও গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে রবিশস্য থেকে শুরু করে সোয়াস গুড়গুড়ি (আলকুশি), আমলকী, তুলসি, কালকাসিন্দা, খেসারি, যব, কাউন, তিসি, বিভিন্ন জাতের ধান, শাক-সবজি, ফুল, ফল, বনজ, ফলজ ও ঔষধি বীজ এবং গাছসহ তাঁর সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেন- ‘কমিউনিটি বীজ ব্যাংক’ থেকে বীজ নিজেরা ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিবেশীদের সাথে বীজ দিয়ে বীজ বিনিময় করেন, আমাদের লক্ষ্য দেশি জাতের বীজ সংরক্ষণ ও জাত টিকিয়ে রাখা। । সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিবেশিরা বাড়ির আঙিনা অথবা পতিত জমিতে প্রয়োজন অনুযায়ী বীজ নিয়ে বপন করেন। আবার মৌসুম শেষে সেখান থেকে আবার বীজ সংগ্রহ করেন। এভাবে সারা বছর বাড়িতে বিভিন্ন নিরাপদ ও পুষ্টিকর শাক-সবজি উৎপাদন করেন। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভার্মিকম্পোস্ট সার ও জৈব বালাইনাশক (পরিবেশবান্ধব কীটনাশক) ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন। তার এসব কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নানা পদের বীজ সংরক্ষণ করছেন ওই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কৃষক। বীজ সংরক্ষণের ফলে পরিবারগুলোর যেমন শাকসবজির চাহিদা মিটছে, অন্য দিকে সেসব সবজি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন তাঁরা। এছাড়াও নারীদের অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষের সমতা, নারীদের কাজের মূল্যায়ন ও সমাজে তাদের গুরুত্ব এবং নারী নেতৃত্ব তৈরিসহ বিভিন্ন জনসচেতনামূলক কাজ করছেন তিনি। কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রগুলোর একটি বড় অবদান হলো রাসায়নিক নির্ভরতা কমানো। এখানে কৃষকরা শিখছেন কীভাবে জৈব সার, গোবর সার, ভার্মিকম্পোস্ট ও প্রাকৃতিক বালাইনাশক ব্যবহার করা যায়। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমছে, মাটির উর্বরতা বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষণ কম হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই শিখন কে›ন্দ্রগুলো গ্রামীণ নারীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই বীজ সংরক্ষণ, সবজি চাষ ও পারিবারিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্র নারীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দৃশ্যমান করছে এবং কৃষিতে তাদের ভূমিকার স্বীকৃতি দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে কার্বন কমাতে এই প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্র গুলো অন্যতম ভূমিকা পালন করছেন। সরেজমিনে দেখা যায়- তানোর উপজেলার প্রসাদ পাড়া কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রের পরিচালনাকারী কৃষাণী কবুলজান তিনি নিজে কমকার্বন নিঃসরণকারী পরিবশেবান্ধব মাটির চুলা আবিষ্কার করেছেন। তিনি এখন পর্যন্ত তার আশপাশে এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের এই চুলা বানানো শিখিয়েছেন তিন হাজারের অধিক। প্রায় সাত হাজারের বেশি পরিবারে এখন এই পরিবেশবান্ধব চুলা ব্যবহার হচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই উদ্যোগ কৃষকদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজার থেকে বীজ, সার ও কীটনাশক কেনার প্রয়োজন কমে যাওয়ায় কৃষকের নগদ খরচ কমছে। এতে করে তারা ঋণের ফাঁদে পড়া থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাচ্ছেন। অনেক কৃষক এখন নিজেদের উৎপাদিত বীজ প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিনিময় করছেন, যা সামাজিক বন্ধনও দৃঢ় করছে। কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্র শুধু প্রশিক্ষণের জায়গা নয়; এটি সেই স্থান যেখানে কৃষকরা বীজ, জ্ঞান ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে এসব শিখন কেন্দ্র দেশীয় বীজ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে, বাজারনির্ভরতা কমাচ্ছে এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উপযোগী সমাধান তৈরি করছে , যার মধ্য দিয়েই কৃষি সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নীতিগত সহায়তা পেলে কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রগুলো কৃষি সার্বভৌমত্ব, জলবায়ু সহনশীলতা ও কৃষকের অধিকার সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ের একটি কার্যকর মডেলে পরিণত হতে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পর্যাপ্ত নীতিগত সহায়তার অভাব এবং কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থায় কৃষি প্রতিবেশবিদ্যার সীমিত অন্তর্ভুক্তি বড় বাধা। কৃষকরা মনে করেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে এই শিখন কেন্দ্রগুলোকে স্বীকৃতি ও সহায়তা দেওয়া হলে কৃষি সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা শিখন কেন্দ্রগুলো কেবল একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নয়; এটি কৃষকের অধিকার, বীজের স্বাধীনতা এবং টেকসই কৃষির জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন। কৃষকের হাতে জ্ঞান ও নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়ে এই শিখন কেগুলো আজ কৃষি সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার এক নতুন শক্তিতে পরিণত হয়েছে। লেখক: মো. শহিদুল ইসলাম নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক বারসিক- বরেন্দ্র অঞ্চল।

Comments