হৃদয়হীন প্রযুক্তির যুগে প্রাণের নিঃশব্দ মৃত্যু

আমাদের চারপাশে আজ এক অদ্ভুত নীরবতা। এটা শান্তির নীরবতা নয়-এটা প্রাণহীনতার নীরবতা। আজকের তরুণ-যুব সমাজ প্রযুক্তি নিয়ে স্বপ্ন দেখে, প্রযুক্তির সাথে সময় কাটায়, প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। গবেষণা, উন্নয়ন, উদ্ভাবন-সবকিছুর কেন্দ্রে আছে যন্ত্র। কিন্তু ভয়ংকর সত্যটা হলো, এই যন্ত্রের পেছনে যে প্রাণশক্তি কাজ করছে, সে বিষয়ে আমাদের ভাবনার কোনো জায়গা নেই। তোমার হাতে যে শক্তি-তা এক প্রাণের বিনিময়ে। তোমার গায়ে যে কাপড়-তা কোনো না কোনো প্রাণের দান। তোমার খাবার, বাতাস, পানি, আলো-সবই প্রাণ আর প্রকৃতির অবদান। তবু প্রশ্ন করি না- এই প্রাণগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায় কি আমাদের নেই? আমরা এমন এক সময়ের মানুষ, যেখানে হৃদয়হীন প্রযুক্তি আমাদের এতটাই গ্রাস করেছে যে আমরা ভুলে গেছি-প্রযুক্তি কখনো রক্ষা করে না, যদি তার ভেতরে প্রাণ না থাকে। সোজা মৌলিক উত্তর-না, হৃদয়হীন প্রযুক্তি তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। চারদিকে হাজারো, লাখো, কোটি কোটি প্রাণ-গাছ, পাখি, নদী, মাটি, পোকা, অদৃশ্য জীবাণু-এই সম্মিলনই তো আমাদের অস্তিত্ব। অথচ আমরা প্রতিদিন সেই সম্মিলনকে ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছি। উন্নয়নের নামে বন উজাড়, নদী হত্যা, বিষ ঢালা মাটিতে, বায়ুতে-এ সবই যেন এখন স্বাভাবিক। যদি তোমার দর্শনে প্রাণ না থাকে, যদি তোমার গবেষণায় জীবন না থাকে, তবে সেই জ্ঞান তোমাকে বাঁচতে দেবে না। হয়তো তুমি দেহে মানুষ, কিন্তু ভেতরে তুমি ইতিমধ্যে রোবট। হয়তো তুমি বুঝতেই পারোনি-তুমি এখন যন্ত্রের দ্বারা চালিত। বিশ্বাস হচ্ছে না? একবার ভেবে দেখো-তোমার রুচি কে ঠিক করে দিচ্ছে? তোমার পছন্দ-অপছন্দ, ক্ষোভ, ভালোবাসা, এমনকি প্রতিবাদকেও বাছাই করে দিচ্ছে? তোমার হাতে ধরা ৬ বাই ৩ ইঞ্চির হৃদয়হীন প্রযুক্তিটাই আজ তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছে। প্রতিমুহূর্তে তোমাকে কমান্ড দিচ্ছে—কখন হাসবে, কখন ক্ষুব্ধ হবে, কখন চুপ থাকবে। আমরা সবাই এখন “রোবটিক মানুষ” হয়ে গেছি। সংবেদন আছে, কিন্তু অনুভব নেই। তথ্য আছে, কিন্তু দায় নেই। প্রযুক্তি আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। এই সময় চারিদিকে প্রাণ ও প্রকৃতি হত্যার যে নিঃশব্দ হাহাকার-সে শব্দ আর পৌঁছায় না তরুণদের কানে। কারণ কানে আছে ইয়ারফোন, চোখে আছে স্ক্রিন, আর হৃদয়ে আছে অ্যালগরিদমের শাসন। আজ আমাদের পরিবেশ বড়ই মুমূর্ষু। নদী শ্বাস নিতে পারছে না, মাটি বিষাক্ত, বাতাস ভারী, বন নিঃশেষ। আর আমরা? আমরা “নেক্সট আপডেট”-এর অপেক্ষায়। সময় এসেছে প্রশ্ন করার- আমরা কি শুধু আরও স্মার্ট যন্ত্র চাই, নাকি বাঁচার মতো একটি পৃথিবী চাই? প্রযুক্তিকে অস্বীকার নয়- কিন্তু প্রযুক্তির ভেতরে প্রাণ, দায়, নৈতিকতা আর মমতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। নইলে একদিন হয়তো যন্ত্র বেঁচে থাকবে, কিন্তু মানুষ-শুধু একটি নিঃশ্বাসহীন স্মৃতি হয়ে থাকবে। লেখক: মো. শহিদুল ইসলাম নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক।

Comments