গণপরামর্শহীন সংস্কারে রাষ্ট্র-জনগণের অপ্রকাশিত দূরত্ব

 গণপরামর্শহীন সংস্কারে রাষ্ট্র-জনগণের অপ্রকাশিত দূরত্ব

-সংস্কার ছেড়ে দেওয়া হোক জনগণের হাতে

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় “সংস্কার” একটি বহুল উচ্চারিত শব্দ। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন দেশ পরিচালনা করছে। কথাছিলো একটি সুস্থ্যধারা পরিস্থিতি তৈরী করে , জনগণের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া। জনগণের হাতে ক্ষমতা বলতে নির্বাচন। একটা সুস্থ নির্বাচন। নির্বাচনের লক্ষ্যেই কাজ করা উচিত। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে নানা কারনে। এই লক্ষ্য ভ্রষ্টতা জনগণ বুঝতে পেরেছে। হয় এটি কৌশলী নয়তো অদক্ষতা । প্রথম পর্যায়ে এই সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন যেমন- সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, ন্যায়বিচার (জুডিশিয়ারি) সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC), জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এর পরবর্তীতে আরও পাঁচটি খাতভিত্তিক সংস্কার কমিশন গঠিত করেছে যেমন - স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম (মিডিয়া),  শ্রম ও কর্মিস্বত্ব বিষয়ক, নারী বিষয়ক, স্থানীয় সরকার। সবমিলিয়ে ১১টি কমিশন। সংবিধানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নিয়েও চলছে এক ধরনের তামাসা। এছাড়ও আইন-শৃঙ্খলা কিংবা সুশাসন-সব জায়গায়ই চলছে নীতিমালার পরিবর্তনের তোড়জোড়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: এই সংস্কারের নকশা তৈরি হচ্ছে কোথায়? কারা করছে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জনগণ কোথায়? এ এক প্রহসনের সময়যেখানে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে জনগণের মতামত ছাড়াই। নির্বাচিত প্রতিনিধি বা জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই গুটিকয়েক অনির্বাচিত ব্যক্তি, পরামর্শক গোষ্ঠী এবং তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগীরা একটি দেশের ভবিষ্যতের গতি নির্ধারণ করছেন। এতে জনগণ আর রাষ্ট্রের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক অপ্রকাশিত দূরত্ব, যা দিনদিন বিস্তৃত হচ্ছে।

সংস্কার, কিন্তু জনগণবিহীন

গণতন্ত্রে সংস্কার হওয়া উচিত গণপরামর্শের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ আমাদের রাষ্ট্রে যে সংস্কারগুলো হচ্ছে, সেগুলোতে জনগণের কোনো মতামতই নেই। শিক্ষা কারিকুলাম হঠাৎ পাল্টে যায়, প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজানো হয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে, সবকিছুই হয় “উন্নয়ন”, “সুশাসন” বা “দক্ষতা”র নামে, কিন্তু জনমতের ছিটেফোঁটাও সেখানে স্থান পায় না। শুধু তাই নয়, যেসব সংস্থা বা ব্যক্তিরা এসব সংস্কারের নকশা তৈরি করছেন, তাদের কেউই জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন, অধিকাংশই দেশীয় বাস্তবতা থেকে দূরে থাকা 'পরামর্শক', সাবেক কর্মকর্তা, অথবা বিদেশি সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নকারী। তাদের দায়বদ্ধতা জনতার কাছে তাকার কথা নয়। তাহলে তারা কোথায় দায়বদ্ধতা? নিশ্চই কোথাও আছে ! 

একটি পরিকল্পিত 'ক্ষমতা হরণ' প্রক্রিয়া?

নব্য সংস্কারের নামে যে প্রক্রিয়া চলছে, তা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক প্রকল্প। লক্ষ্য একটাই-জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অধিকার ধীরে ধীরে হরণ করা। ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভাগুলোসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি ছাড়া আমলাদের হাতে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভোটের সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য দাড় করানো হেচ্ছে জনগণের সামনে। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation বা PR) তথ্য নিয়ে চলছে হইচই, রাজনীতি সরিয়ে ‘নিরপেক্ষতা’র নামে জনগণকে ভোঁতা করে তোলা হচ্ছে, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর সংগঠন পরিচালনায়ও চাপানো হচ্ছে ‘বিদেশি মডেল’। এ যেন গণতন্ত্রকে ঘুম পাড়িয়ে, এক ‘ম্যানেজড স্টেট’ তৈরি করার প্রকল্প, যেখানে রাষ্ট্র চালাবে কিছু সুবিধাভোগী, আর জনগণ শুধু "উপকারভোগী" রয়ে যাবে। এখানে কোনো ‘জনমতের’ প্রয়োজন নেই, কারণ সবকিছুই “বিশেষজ্ঞ পরামর্শে” চলবে।

নব্য ঔপনিবেশিকতার ছায়া

এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নব্য ঔপনিবেশিক কৌশলের অংশ বললে ভুল হবে না। আগে ঔপনিবেশিক শক্তি বাহির থেকে এসে শাসন করত, এখন তারা আসে ‘পরামর্শ’, ‘সহযোগিতা’ এবং ‘সংস্কার’-এর নামে। তারা বলে-"তোমাদের আইন পুরাতন, আমরা আপডেট করব", "তোমাদের শিক্ষা পদ্ধতি অকার্যকর, আমরা দক্ষ করব", "তোমাদের স্থানীয় সরকার দুর্বল, আমরা শক্ত করব" এভাবে তারা জনগণের আত্মবিশ্বাস, আত্মপরিচয়, এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এইভাবেই একটি জাতির উপর প্রভাব বিস্তার করা হয় "সহযোগিতার" ছদ্মবেশে। আজকের বাংলাদেশেও সেই চিহ্ন স্পষ্ট। রাষ্ট্রের উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ কমছে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থার বা অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাব বাড়ছে।

এই সংস্কার কার জন্য, কে ভোগ করবে?

যে সংস্কার জনগণের জীবনকে ছুঁয়ে যাবে, সেই সংস্কারে জনগণের অংশগ্রহণ থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন হচ্ছে জনগণের বাইরে। কেউ জানে না, কীভাবে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে, কারা করছে। পাবলিক হিয়ারিং নেই, সংসদীয় বিতর্ক নেই, সংবাদপত্রে বিশ্লেষণ নেই, তবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটে চলেছে। যা হচ্ছে অনলাইন প্লাটফর্মে। এই সংস্কারের চূড়ান্ত ফলাফল হলো- একটি দূরবর্তী, নাগরিক-বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থা; যেখানে জনগণের দাবির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কোন একটি নিষিদ্ধ শক্তিকে সামনে আনা। 

সংস্কার হোক জনগণের হাতে

এই অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ হবে এক 'সাইলেন্ট ডিস্টোপিয়া', যেখানে প্রতিরোধহীনভাবে জনগণের রাজনৈতিক শক্তি খর্ব হতে থাকবে। তাই এখনই সময় জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার করার, সংস্কারের মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার।

তাই প্রয়োজন - গণপরামর্শ বাধ্যতামূলক করা: জাতীয় ও স্থানীয় যে কোনো নীতিমালা বা সংস্কার বাস্তবায়নের আগে জনগণের মতামত নিতে হবে প্রত্যক্ষভাবে, ভোটের মাধ্যমে। সংসদীয় পরিস্থিতি তৈরী করা- কোনো প্রকল্প বা নীতিমালা সংসদীয় বিতর্ক ছাড়া কার্যকর করা যাবে না। জনমাধ্যমে কার্যকর  আলোচনা টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নীতির উপর খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। নির্বাচিত প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করা- যাতে সংস্কার বাস্তবতা-নির্ভর হয় এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।

পরিশেষে- 

রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। আর সংস্কার যদি সেই জনগণকে বাদ দিয়েই হয়, তবে তা আর সংস্কার নয়-তা হয় শাসন, হয় দমন। আজ আমাদের প্রয়োজন জনগণভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা। প্রয়োজন এমন এক সংস্কারপ্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ হবে নেতৃত্বের অংশীদার, শুধুমাত্র দর্শক নয়। তাই সর্ব ষ কথা হলো-সংস্কার হোক জনগণের হাতে।

Panel Author: 

Peoples Political Agency. Bangladesh

Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রসীমা ভেঙে সাম্রাজ্য: আমেরিকার আগ্রাসন, ভেনিজুয়েলা ও মানবতার লাশ

ব্যবসায়িক চশমায় পরিবেশ: নীতি নির্ধারণে কি স্বার্থের সংঘাত ঘটবে ?

Failure to Ban Highly Hazardous Pesticides (HHPs) Violates Human Rights

উত্তরে বন্যা ও অসাম্য উন্নয়ন দর্শন

বরেন্দ্র অঞ্চলে প্লাস্টিক মুক্ত কৃষি ও জীবন গড়তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা: একটি নৃতাত্বিক মাঠ পর্যবেক্ষণ

হৃদয়হীন প্রযুক্তির যুগে প্রাণের নিঃশব্দ মৃত্যু

শুকনো নদীর বুকে বিষের স্রোত