পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে খাপখেয়ে নেয়া সবজি জাতের সন্ধান
পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে খাপখেয়ে নেয়া সবজি জাতের সন্ধান
পানি ও খরা সহনশীল সবজি পাতা করলা
পাতা করলার ওইতিহাসিক পর্যালোচনা-
কালাসোনা চরের প্রবীণ নারীদের ভাষ্যমতে জানা যায় -নিজেদের দীর্ঘ অবিঙ্গতালদ্ধ জ্ঞান থেকে দেখেন একধরনের লতা জাতীয় উদ্বিদ যা দেখতে কিছুটা শিমের গাছের মত,তবে এর থেকে যে ফল বা সবজি হয় তা দেখতে পাতার মত। এই গাছটি শিমের গাছের মত ঝাংলা বা গাছে পেছিয়ে ওঠে , সব ধরনের দূর্যোগ সহ্য করতে পারে। কি বর্ষা, কি খরা, আবার গভীর পানিতেও দিব্যি টিকে থাকে। সারা বছর ব্যাপী ফলন দেয়। দুর্যোগের সময় কিছু মানুষ এটি সবজি হিসেবে রানাœ্ করে খেয়ে দেখেন এটি খেতেও সুস্বাদু, পরবর্তিতে তারা জানতে পারেন সবুজ সবজি হিসেবে এতে আছে প্রচুর ভিটামিন। এভাবে চরের প্রথম কোন এক অজানা মানুষের কাছ থেকে এই সবজি রান্না করে খবার রেওয়াজ চালু হয় ,তখন থেকেই চরে এটি স্বল্প পরিসরে বাড়ির আনাচে-কানাচে চাষ করেন চরের নারীরা। তবে স্থানীয় কেউ কেউ মনে করেন কালাসোনার চরে প্রথম এই পাতা করলা বাড়ীর উঠানে চাষ করেন স্থানীয় কৃষানী মমতা বেগম। তিনি প্রায় ১০ বছর আগে উদাখালীর চরের এক আতœীয়ের বাড়ী থেকে এর বীজ নিয়ে আসেন। পলাশ বাড়ী সরকারী কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যপক মোঃ আশরাফুজ্জামান মিলন বলেন- “ গাইবান্ধার মাঝ দিয়ে ব্রক্ষপুত্র-যমুনা নদী বয়ে গেছে, আর এসব নদীর উৎস স্থল হল উজানে ভারতের পাহাড় গুলো, অনেক সময় পাহাড়ী অনেক উদ্ভিদ,লতা,গুল্ম বীজ পানির সাথে ভেসে এসে চরে জন্ম বি¯তার করে,হয়তো অতীতে এভাবেই এই পাতা করলা এসব চরে আসতে পারে, যা আজ সময়ের বিবর্তনে মানুষের খাদ্য তালিকায় স্থান পেয়েছে।”
পাতা করলার নাম করণঃ-
সবজিটির বাহ্যিক গঠন ও গাছের বৈশিষ্ঠ্যের কারনে চরবাসীরা এর নাম দেন পাতা করলা। এর গাছ দেখতে শীম গাছের মত, পাতা বরবটি শিমের মত, শিমের মতই এটি গাছে ধরে। সবজিটি দেখতে পাতার মত, চারি দিকে করলার মত ছোট ছোট উচু নিচু।
পাতা করলা চাষের প্রসারঃ
সময়ের পরিক্রমায় ও এলাকার বা¯তব পরিস্থিতির সাথে খাপখেয়ে চলতে থাকা পাতা করলা আজ চরের অনেক মানুষের দুর্যোগকালিন খাবার,এবং দুর্যোগকালিন শাকসবজির সংকট মোকাবেলায় এর চাহিদা দিন দিন বাড়তেই আছে। চর এলাকা পেরিয়ে এখন এই সবজি মেইন ভ’মিতেও দুর্যোগের সময় মানুষের খাদ্য হিসেবে অবদান রাখছে। মেইন ভ’মির হোসেনপুর, নীলের বিটা সহ বিভিন্ন এলাকায় এর বিস্তার ঘটেছে।এর পিছনে কালাসোনা চর কৃষক সংগঠনের নরাীরা বেশী অবদান রেখেছেন। বিগত ২০১০ সালে তাদের গড়া নিজস্ব কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে এই পাতা করলার বীজ ও অবিজ্ঞতা এক চর থেকে আরেক চরে এমন কি মেইন ভ’মিতে বিনিময় করে এর প্রসার ঘটিয়েছেন। বারসিক ফুলছড়ি রিসোর্স সেন্টার ও কালাসোনা কৃষক সংগঠনের যৌথ আযোজনে এ পর্যšত স্থানীয় শাকসবজির পাড়া মেলা, খাদ্য উৎসব, রান্না প্রতিযোগীতা, প্রাণবৈচিত্র্য উৎসব,জেলা- উপজেলায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের নিজস্ব স্থানীয় সম্পদ ও খাদ্য সম্বার নিয়ে আলোচনা করতে পাতা করলার বিষয়টি সকল মহলে গুরুত্ব বাড়ে।
পাতা করলার চাষ পদ্ধতিঃ
সাধারনত চৈত্র্য - বৈশাখ মাসে এর বীজ রোপন করা হয়। চর এলাকায় এর আগেই রোপন করে থাকে , কারন আষাঢ় শ্রাবন মাসে বন্যার সময় যেন ফলন পাওয়া যায় সে সময় ভেবেই রোপন করেন চর কৃষানীরা । রোপনের ১২০ দিন পর পুরাপুরি ফলন দিতে থাকে। বীজ দেখতে মটর কালাই এর মত। বীজ রোপনের ১-২ সপ্তাহের মধ্যে গজায়। বীজ গজানোর পর গোড়ায় কয়েকটি কঞ্চি বা সলা গেড়ে দেয়া হয়, এই কঞ্চি বা সরা দিয়ে গাছ ধীরে ধীরে উপরে দিকে উঠতে থাকে। তখন ঝাংলা , বেড়া বা বড় গাছে তুলে দেয়া হয়। পাতা করলা গাছের আর একটি প্রধান বৈশিষ্ঠ্য এটি একবার রোপন করলে দ্বিতীয়বার রোপন করা লাগেনা কারণ এর শিখড় বা লতা থেকে আবার নতুন কুড়ি গজিয়ে আবার সাবলিল গাছ হয়। বাড়ীর আনাচে কানাচে, উচু-নিচু এবং পরিত্যাক্ত জমিতে এটি চাষ করা যায়্। পোকামাকড়ের আক্রমন নেই বললেই চলে। রাসায়নিক – কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হয়না, গোড়ায় কিছু পরিমান গবর সার দিলেই এর গাছ সাবলিল থাকে। পাতা করলার গোড়ায় ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত পানি থাকলেও এটি মরেনা। এমনকি চৈত্র্য- বৈশাখ মাসের প্রচন্ড খরার সময়ও এটির কোন ক্ষতি হয়না। পাতা কড়লা যেমন পানি সহনশীল তেমনি খরা সহনশীল একটি জাত। এ প্রসঙ্গে কালাসোনা চরের কৃষাণী মনোয়ারা বেগম (৪৫) বলেন-“ পাতা করলার মত কোন সবজি গাছ আজো পাইনি , এই গাছ খুব(বেশী) পানি আর খুব রোদ(খরা) সহ্য করতে পারে।” তার মতে বন্যা এবং খরা এ দুটি দুর্যোগের সাথে চরবাসীদের প্রতিবছর লড়তে হয়। তাই পাতা করলা এ অঞ্চলের জন্য দুর্যোগকালিন সবজির শেষ ভরসা।
বীজ সংরক্ষন পদ্ধতি ও ফলনঃ
গাছের সাথে সাবলিল ও সুন্দর দেখে কয়েকটি পাতা করলা রেখে পাকানো হয়। ভালো করে পাকার পর তা তুলে এনে খোসা হতে বীজগুলো ছড়ানো হয়, এর পর রোদে ভালো করে শুকিয়ে বয়ামে রাখা হয়। আবার অনেকে খোসা সহ খুব ভালো করে রোদে শুকিয়ে বয়ামে বা ঘরের চালার সাথে বেধেঁ রাখে। যদি গাছ ভালো হয় তাহলে একটি বা দুটি গাছ থেকে সারা বছর মিলে ২ মন পর্যন্ত পাতা করলা সংগ্রহ করা যায়। একবার ফলন দিতে শুরু করলে পরবর্তী আষাঢ়-শ্রাবন-ভাদ্র- আশ্বিন পর্যন্ত ফলন দেয়।
পাতা করলার খাদ্যগুনাগুন ও বাজার মূল্যঃ
দুর্যোগকালিন সময়ে পাতা করলার ব্যবহার বেশী হলেও প্রায় সারা বছর এটি সবজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাতা করলা খেতে সুস্বাদু, পাতা করলা বেশী বয়স হবার আগেই কচি অবস্তায় রান্না করে খেতে বেশী সুবিধা। বেশী বয়স হলে আঁশ হয় বেশী। তবে স্থানীয়দের মতে দুটির দুই রকমের স্বাদ। পাতা করলার ভাজি, ভর্তা-ছানা,লাবড়া করে খাওয়া যায়। তবে ভাজি- ভর্তার সাথে শুটকি মাছ মিশিয়ে বেশী মজা। মাছ- মাংসের সাথে পাতা করলা অত্যšত সুস্বাদু হয়।
বর্তমান পাতা করলার বাজার মূল্য প্রতি কেজী ২০-৩০ টাকা। চরের অনেক নারী বাড়ীর আনাচে –কানাচে বা পরিত্যক্ত জায়গায় পাতা করলার চাষ করে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন। উদাহরণ স্বরুপ- কালাসোনার রাবেয়া বেগম, মনোয়ারা বেগম, লাভলী বেগম, জেসমিন আরা, অন্য দিকে মেইন ভ’মি হোসেনপুরের রুনা বেগম।
শেষের কথা:
এ কথা বলতে আর অপেক্ষা সইচে না যে, গ্রামে গঞ্জে যখন স্থানীয় উদ্বিদ বৈচিত্র্যের, অচাষকৃত শাকসবজির পাড়া মেলা ও খাদ্য উৎসব, রান্না প্রতিযোগীতায় গ্রামীণ নারীরা অংশগ্রহণ করে তাদের বৈচিত্র্যময় খাদ্য সম্বারের বৈচিত্র্যময় প্রদর্শন করেন, তখন অনেক শিক্ষিত এবং প্রথাগত উন্নয়নের তোকমা তোলা মানুষ ভুরু কুচকে মিটকা হাসি মেড়ে বলে সেকালি কাজ একালে করে কি হবে, এখন মানুষ অনেক আধুনিক আর খাদ্যে অনেক সচেতন। তাদের উদ্দেশ্যে বিনীত নিবেদন যে এ দেশের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার ও র্চচার অভাবে আমরা দিন দিন পরনির্ভশীল হয়ে যাচ্ছি। আর এর নাম স্থায়ী উন্নয়ন নয়। স্থায়ী উন্নয়নের সত্যিকারের নাম নিজস্ব সম্পদের ব্যবহার ও উন্নয়ন। আমাদের আশে পাশে অনেক খাদ্য সম্বার লুকিয়ে আছে , যে গুলোকে আমরা খাদ্য বলেই জানিনা, আসুন সেগুলো নির্বাচন করি এবঙ আমাদের খাদ্য সম্বারকে আরো সমৃদ্ধ করি। দীর্গদিন প্রত্যক্ষ্য পর্যবেক্ষনে কালাসোনার নারীরা তাদের অবিঞ্জতালব্ধ জ্ঞান থেকে দুর্যোগসহনশীল পাতা করলা দুর্যোগকালিন খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। আর তাদের অবিজ্ঞতা বিনিময়ের ফলেই আজ ফুলছড়ির অনেক চরে এমনকি মেইন ল্যান্ডের অনেক পরিবারে পাতা করলা সবজি হিসেবে ব্যবহার করছে।বিঃ দ্রঃ
চরাঞ্চলে ম াঠ গবেসণার সময় স্থানীয় চরাঞ্চলে দেখা গেছে এবং চরের মানুষ এটি ব্যবহার করে। এটি চর ছাড়াও সমতল ভুমিতেও অনেকে এখন ব্যবহার করেন। এটি প্রথম নথিভুক্ত করি ২০১০ সালে। ইদানিং দেখা যাচ্ছে এই পাতা করলার বীজ বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। কোন কোন কোম্পানি আবার সেগুলো হয়তো আবিষ্কারের কাহিন িহিসেবে দেকাচ্ছে। এরকম মানুষের/জনসম্পদগুলো কোম্পানীরা চুরি করে নিজের নামে প্যাটেন্ট করে নিচ্ছে। যা সম্পূর্ন অবৈধ ও অনৈতিক।
#পাতাকরলা
#পাতা_করলা
লেখক:
মো: শহিদুল ইসলাম
নৃবিজ্ঞানী , বাংলাদেশ রিসো
র্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ-বারসিক।


Comments