মানুষ বাঁচে কিসে ?
মানুষ বাঁচে কিসে?
- এক আন্তঃসম্পর্কিত ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সন্ধানে
মানুষ একা নয়। সে প্রাণবৈচিত্র্যের এক অণু মাত্র। তার আশপাশে আছে কোটি কোটি জীব, উদ্ভিদ, জলজ প্রাণ, কীটপতঙ্গ, ছত্রাক, অণুজীব। এই সমগ্র জীববৈচিত্র্যের মাঝে মানুষ একটি সন্নিবেশ মাত্র, প্রভু নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মানুষ নিজেকে এই বাস্তুসংস্থানের নিয়ন্ত্রক ভাবতে শিখেছে। আর এখানেই শুরু আমাদের সর্বনাশের।
একটি বিল, একটি পুকুর, একটি জলাভূমি শুধু জলধারণের জায়গা নয়। ওখানে বাঁচে মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, সাপ, পাখি, কচুরিপানা, শাপলা-শালুক, আর লক্ষ লক্ষ অদৃশ্য মাইক্রোব। এগুলো মিলেই গড়ে ওঠে একেকটি ক্ষুদ্র বাস্তুতন্ত্র (ecosystem)। সেই বাস্তুতন্ত্র আবার সংযুক্ত থাকে বৃহত্তর খাদ্য শৃঙ্খলের সঙ্গে। মাছ খায় পোকা, পাখি খায় মাছ, মানুষ খায় পাখি, এ এক পরস্পর নির্ভর অস্তিত্বের সমাবেশ। এখানেই বাস্তুসংস্থানের মূলনীতি-সবাই বাঁচে সবাইকে নিয়ে।
কিন্তু আজ আমরা কী করছি? আমরা বিল ভরাট করছি, জলাভূমি দখল করে গড়ে তুলছি কংক্রিটের শহর। নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, বন কেটে ফেলা হচ্ছে। প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে তাদের আবাসস্থল থেকে। কৃষিজমিতে রাসায়নিক প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হচ্ছে মাটির জীব। এই আত্মঘাতী উন্নয়ন মানুষকে যেমন বিচ্ছিন্ন করছে প্রকৃতি থেকে, তেমনি ধ্বংস করছে তার টিকে থাকার ভিত।
এখানে এসে পড়তে হয় আন্তঃসম্পর্কের জায়গায়। প্রকৃতি আমাদের খাদ্য দেয়, বায়ু দেয়, পানি দেয়, ওষুধ দেয়, এমনকি মানসিক প্রশান্তিও দেয়। প্রকৃতির বিনিময়ে মানুষ কী দেয়? প্রতিদান? কৃতজ্ঞতা? না। বরং শোষণ, দখল, বিনাশ। ফলে জলবায়ু বদলায়, বৃষ্টি অনিয়মিত হয়, খরা বাড়ে, রোগ বাড়ে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। অর্থাৎ মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নিজেরই মৃত্যু ডেকে আনে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের সেবা যদি অর্থমূল্যে হিসাব করা হয়, তবে তা বছরে প্রায় ১২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের। অথচ এই সেবাগুলো বিনামূল্যে আমাদের দিচ্ছে প্রকৃতি। আমরা তার দাম বুঝি না, যতক্ষণ না তা হারিয়ে যায়।
আমরা কী করতে পারি?
-
জলাধার, বিল, খাল-জলাভূমি রক্ষা করতে হবে। এগুলো কেবল পানি ধরে রাখে না, জীববৈচিত্র্যের ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে।
-
রাসায়নিকহীন কৃষি চর্চা করতে হবে, যাতে মাটি ও পোকামাকড় বাঁচে।
-
স্থানীয় প্রজাতির গাছ রোপণ ও বন সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে।
-
নগর উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব, প্রাণবান্ধব।
-
সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করতে হবে বাস্তুসংস্থান, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে।
এই সচেতনতা মানুষকে ফিরিয়ে আনবে প্রকৃতির কোলে। মানুষ বাঁচবে তখনই, যখন সে বাঁচাবে অন্যদের। এই পারস্পরিক নির্ভরতা বুঝতে পারাটাই হচ্ছে মানব সভ্যতার টিকে থাকার শেষ আশ্রয়।
.jpg)
Comments