সবুজ মোড়কের আড়ালে নতুন ক্ষুধা

খাদ্য দিয়ে জ্বালানি ও ব্যাগ তৈরির বিপজ্জনক ভবিষ্যৎ

এক পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন না খেয়ে ঘুমায়, শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে, কৃষক আত্মহত্যা করে, আর খাদ্যের দাম বাড়লে দরিদ্র মানুষের থালায় ভাত কমে যায়, সেই পৃথিবীতেই খাদ্যশস্য দিয়ে গাড়ির জ্বালানি, প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যাগ কিংবা তথাকথিত “সবুজ পণ্য” তৈরির প্রতিযোগিতা বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি সত্যিই পরিবেশবান্ধব, নাকি এক নতুন বৈশ্বিক সংকটের সূচনা?

বর্তমানে ভুট্টা, আখ, সয়াবিন, আলু, ক্যাসাভা, পাম অয়েলসহ বহু খাদ্যশস্য ব্যবহার হচ্ছে বায়োফুয়েল, বায়োপ্লাস্টিক এবং বায়োডিগ্রেডেবল পণ্য তৈরিতে। বহুজাতিক কোম্পানি ও উন্নত দেশগুলো এটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিদ, কৃষি গবেষক ও খাদ্য অধিকারকর্মীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। এটি “Food vs Fuel” বা “Food vs Materials” নামে এক গভীর নৈতিক ও পরিবেশগত দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।

২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সংকটের সময় এই বিতর্ক ভয়াবহভাবে সামনে আসে। গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ ভুট্টা ইথানল উৎপাদনে ব্যবহারের ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। “The Agricultural Ethics of Biofuels” শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, খাদ্যশস্যকে জ্বালানিতে রূপান্তর করা শুধু বাজার নয়, নৈতিক প্রশ্নও তৈরি করে। কারণ এটি ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তির উপর প্রভাব ফেলে। (MDPI)

সমস্যা কেবল খাদ্যশস্যের ব্যবহার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমি, পানি ও কৃষি-অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণও। যখন কোনো দেশে খাদ্য উৎপাদনের জমি জ্বালানি ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, তখন স্থানীয় কৃষি বৈচিত্র্য কমে যায়। জলসম্পদ বেশি ব্যবহৃত হয়, রাসায়নিক নির্ভরতা বাড়ে এবং ক্ষুদ্র কৃষক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। “The water-land-food nexus of first-generation biofuels” গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রথম প্রজন্মের বায়োফুয়েল খাদ্য উৎপাদনের জমি ও পানির উপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করছে। (Nature)

আজকাল বাজারে “বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ” বা “কর্ন-স্টার্চ প্লাস্টিক” নামে যে পণ্যগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে, সেগুলোর অনেকই খাদ্যশস্যভিত্তিক। বাহ্যিকভাবে এটি প্লাস্টিক দূষণের সমাধান মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে তা খাদ্যব্যবস্থা ও কৃষি-ভূমির উপর নতুন চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে কৃষিজমি সীমিত এবং খাদ্য নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত হয়নি, সেখানে খাদ্যশস্যকে শিল্পের কাঁচামালে রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ হতে পারে।

বিশ্বের অনেক পরিবেশবাদী এখন বলছেন-সব সবুজ প্রযুক্তি  সত্যিকারের সবুজ নয়। কারণ যদি পরিবেশ রক্ষার নামে মানুষের খাদ্য কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে সেটি টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। বরং এটি “Green Colonialism” বা “সবুজ উপনিবেশবাদ”-এর নতুন রূপ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে উন্নত বিশ্বের পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার খরচ বহন করবে দরিদ্র দেশের কৃষক ও ভোক্তারা।

তবে বিতর্কের আরেকটি দিকও রয়েছে। কিছু গবেষক বলছেন, সব ধরনের বায়োফুয়েল একই রকম ক্ষতিকর নয়। খাদ্যশস্যের পরিবর্তে কৃষি-আবর্জনা, শৈবাল, বনজ বর্জ্য বা অনাবাদি জমির জৈব উপাদান ব্যবহার করলে তুলনামূলক কম ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বায়োফুয়েল নিয়ে তাই নতুন গবেষণা চলছে। (Nature)

বাংলাদেশের মতো খাদ্য ও পানি সংকটপ্রবণ দেশে এই বিতর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কৃষিজমি কমছে, পানির স্তর নিচে নামছে, জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় খাদ্যশস্যকে জ্বালানি বা শিল্পপণ্যের কাঁচামাল বানানোর আগে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। শুধু “বায়ো” বা “ইকো” শব্দ শুনে হাততালি দিলেই হবে না; দেখতে হবে সেটি কোন সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে।

কারণ, পৃথিবীকে রক্ষা করার নামে যদি মানুষের খাদ্য কেড়ে নেওয়া হয়, তবে সেটি পরিবেশবাদ নয়, বরং ভবিষ্যতের নতুন বৈষম্য।


=================

লেখক:

মো. শহিদুল ইসলাম

নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক

Shahidul546mh@gmail.com

Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রসীমা ভেঙে সাম্রাজ্য: আমেরিকার আগ্রাসন, ভেনিজুয়েলা ও মানবতার লাশ

ব্যবসায়িক চশমায় পরিবেশ: নীতি নির্ধারণে কি স্বার্থের সংঘাত ঘটবে ?

Failure to Ban Highly Hazardous Pesticides (HHPs) Violates Human Rights

উত্তরে বন্যা ও অসাম্য উন্নয়ন দর্শন

বরেন্দ্র অঞ্চলে প্লাস্টিক মুক্ত কৃষি ও জীবন গড়তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা: একটি নৃতাত্বিক মাঠ পর্যবেক্ষণ

হৃদয়হীন প্রযুক্তির যুগে প্রাণের নিঃশব্দ মৃত্যু

শুকনো নদীর বুকে বিষের স্রোত